Monday, May 18, 2026

প্রধানমন্ত্রী আগামীকাল উদ্বোধন করবেন ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’: ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা

প্রধানমন্ত্রী আগামীকাল উদ্বোধন করবেন ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’: ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা 

প্রধানমন্ত্রী আগামীকাল উদ্বোধন করবেন ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’: ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা

ঢাকা, ১৮ মে ২০২৬: দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে সরকার এবার আয়োজন করছে তিন দিনব্যাপী ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’। আগামীকাল মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ভূমি ভবনে এ মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একযোগে শুরু হবে এই বিশেষ সেবা মেলা, যা চলবে আগামী ২১ মে পর্যন্ত।

আজ রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান মিজানুর রহমান মিনু। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও দুর্নীতিমুক্ত করার যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, ‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ সেই উদ্যোগেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এবারের প্রতিপাদ্য: জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা

এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—
“জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ ভূমি এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ”।

সরকারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভূমি খাতে জটিলতা, দালালচক্র, দুর্নীতি এবং নাগরিক হয়রানির যে অভিযোগ ছিল, তা দূর করতে প্রযুক্তিনির্ভর ভূমি ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। সেই লক্ষ্যেই ভূমি সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হয়েছে।

ভূমিমন্ত্রী বলেন, “ভূমি সেবা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। নাগরিকরা ঘরে বসেই অনলাইনে নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, খতিয়ান সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবা পাচ্ছেন। মেলার মাধ্যমে আমরা সাধারণ মানুষকে এসব ডিজিটাল সেবার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত করতে চাই।”

উদ্বোধনের পর বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, মেলা উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী ভূমি ভবনে স্থাপিত বিভিন্ন স্টল ও সেবা কেন্দ্র ঘুরে দেখবেন। এ সময় তিনি—

  • ডিজিটাল ভূমি সেবা স্টল

  • নাগরিক সেবা কেন্দ্র

  • কল সেন্টার

  • ডে-কেয়ার সেন্টার

  • ই-নামজারি সেবা বুথ

  • অনলাইন কর প্রদান কেন্দ্র

পরিদর্শন করবেন।

প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে রাজধানীর ভূমি ভবন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি মেলার বিভিন্ন স্টলকে আধুনিক প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক সেবায় সাজানো হয়েছে।

কী কী সেবা মিলবে মেলায়?

‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’-এ সাধারণ মানুষ সরাসরি বিভিন্ন ভূমি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। ভূমি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নাগরিকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো বা বিভিন্ন অফিসে ঘুরতে না হয়, সেজন্য এক ছাদের নিচে একাধিক সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

মেলায় যেসব সেবা পাওয়া যাবে, তার মধ্যে রয়েছে—

  • ভূমি পোর্টালে নিবন্ধন

  • ই-নামজারি আবেদন গ্রহণ

  • অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর (এলডি ট্যাক্স) প্রদান

  • খতিয়ান সংগ্রহ

  • ডিসিআর সংগ্রহ

  • মৌজাম্যাপ সংগ্রহ

  • সার্টিফায়েড কপি বিতরণ

  • জমির তথ্য যাচাই

  • ভূমি সংক্রান্ত পরামর্শ প্রদান

  • ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদান

এছাড়াও নাগরিকরা মেলা প্রাঙ্গণ থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে কিছু সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। বিশেষ করে খতিয়ানের সার্টিফায়েড কপি ও ভূমি উন্নয়ন কর প্রদানের সুবিধা মেলায় ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।

ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনায় সরকারের বড় উদ্যোগ

ভূমি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনার জন্য একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম

  • ল্যান্ড জোনিং

  • অনলাইন রেকর্ড সংরক্ষণ

  • ডিজিটাল ম্যাপিং

  • ই-নামজারি

  • অনলাইন খাজনা প্রদান

  • জমি রেজিস্ট্রেশনের সঙ্গে সঙ্গে মালিকানা সনদ প্রদান

সরকার ভবিষ্যতে উপজেলা ভূমি অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মধ্যে সমন্বয় করে একক ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জমি কেনাবেচার পর আলাদা করে নামজারি করতে হবে না। ফলে সময়, খরচ এবং ভোগান্তি—সবই কমে আসবে।

দুর্নীতি ও হয়রানি কমাতে ‘হিউম্যান টাচ’ কমানোর উদ্যোগ

সংবাদ সম্মেলনে ভূমিমন্ত্রী বলেন, ভূমি সেবায় মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ বা ‘হিউম্যান টাচ’ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ, নাগরিক হয়রানি ও দুর্নীতির অন্যতম কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালচক্রকে দায়ী করা হয়ে আসছে।

তিনি বলেন, “অটোমেশন বাড়ানো হলে নাগরিকরা ঘরে বসেই সেবা পাবেন। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমে যাবে।”

সরকার ইতোমধ্যে মিউটেশন, এলডি ট্যাক্স, খতিয়ানসহ বিভিন্ন সেবাকে অনলাইনে নিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে আরও সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

প্রান্তিক জনগণের জন্য বিশেষ গুরুত্ব

ভূমিসেবা মেলার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ভূমি সেবা পৌঁছে দেওয়া। দেশের অনেক মানুষ এখনো অনলাইনভিত্তিক ভূমি সেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে।

সেজন্য জেলা প্রশাসন, উপজেলা ভূমি অফিস, ইউনিয়ন ভূমি অফিস এবং ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে সরাসরি জনগণকে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

মেলায় উপস্থিত কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে হাতে-কলমে দেখিয়ে দেবেন কীভাবে—

  • অনলাইনে আবেদন করতে হয়

  • ভূমি কর পরিশোধ করতে হয়

  • খতিয়ান যাচাই করতে হয়

  • জমির মালিকানা তথ্য দেখা যায়

ভূমি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে বিশেষ পরামর্শ কেন্দ্র

মেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নাগরিকদের জন্য ভূমি পরামর্শ সেবা। অনেক মানুষ জমি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ, জাল দলিল, নামজারি জটিলতা কিংবা সীমানা সমস্যায় ভোগেন। এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিতে বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা মেলায় উপস্থিত থাকবেন।

যেসব নাগরিক নিজেদের জমি সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে বিভ্রান্তিতে আছেন, তারা সরাসরি সংশ্লিষ্ট স্টলে গিয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা নিতে পারবেন।

হটলাইন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম

ভূমি সেবা সংক্রান্ত অভিযোগ ও তথ্য সহায়তার জন্য মেলায় জাতীয় হটলাইন ১৬১২২ এবং বিভাগীয় হটলাইন ০১৭০৬৮৮৮৭৮৭ ব্যাপকভাবে প্রচার করা হবে।

এছাড়া দর্শনার্থীদের মধ্যে “ভূমি আমার ঠিকানা” শীর্ষক তথ্যবহুল বুকলেট বিতরণ করা হবে। সহজ ভাষায় তৈরি এ বুকলেটে নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি সেবা, আবেদন পদ্ধতি এবং করণীয় তুলে ধরা হয়েছে।

ব্যাপক প্রচারণা চলছে সারা দেশে

মেলার সফল আয়োজন নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে সারা দেশে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের মাধ্যমেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

জেলা ও উপজেলা প্রশাসনগুলোকে মেলা উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনেক এলাকায় ইতোমধ্যে ব্যানার, ফেস্টুন ও ডিজিটাল প্রচারণা শুরু হয়েছে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা

ভূমি খাতে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। বিশেষ করে নামজারি, খাজনা প্রদান এবং খতিয়ান সংগ্রহের মতো কাজে মানুষের সময় ও অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ বহু পুরনো।

নাগরিকদের আশা, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে—

  • দালাল নির্ভরতা কমবে

  • ঘুষ ও দুর্নীতি হ্রাস পাবে

  • দ্রুত সেবা পাওয়া যাবে

  • জমি সংক্রান্ত মামলাও কমে আসবে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে এবং ভূমি সংক্রান্ত তথ্য আরও নিরাপদ হবে।

সংবাদ সম্মেলনে যারা উপস্থিত ছিলেন

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন—

  • মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন

  • এ এস এম সালেহ আহমেদ

  • মো. এমদাদুল হক চৌধুরী

  • নাসরিন জাহান

উপসংহার

‘ভূমিসেবা মেলা-২০২৬’ শুধু একটি মেলা নয়, বরং বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের একটি বড় পদক্ষেপ। প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব সেবা চালুর মাধ্যমে সরকার ভূমি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পরিকল্পনাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা হবে আরও আধুনিক, নিরাপদ ও দুর্নীতিমুক্ত। আর সাধারণ মানুষও পাবেন দ্রুত, সহজ ও ঝামেলামুক্ত ভূমি সেবা।

No comments:

Post a Comment